চট্টগ্রাম নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে চলমান আন্দোলনে চট্টগ্রাম বন্দরে থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক বদলি, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ ও সম্পদ তদন্তের ঘোষণার পর গ্রেপ্তার আতঙ্কে অনেক নেতাকর্মী আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলসহ চার দফা দাবিতে গত জানুয়ারি মাসের শেষ দিক থেকে বন্দর এলাকায় আন্দোলন শুরু হয়।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রথমে কয়েক দিন নির্দিষ্ট সময় কাজ বন্ধ রাখেন শ্রমিকরা। পরে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু হলে বন্দর কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানান, বর্তমান সরকারের সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়া হচ্ছে না। তার এই বক্তব্যের পর আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে ভাবা হবে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের অভিযোগ, আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টির অভিযোগ তুলে শনিবার রাত থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত ডিবি পরিচয়ে ছয়জন শ্রমিক-কর্মচারীকে তুলে নেওয়া হয়েছে। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয়নি।
সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, শক্তি প্রয়োগ করে আন্দোলন দমন করতে চাইলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। আলোচনা ছাড়া সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ১৫ জন কর্মচারীকে শাস্তিমূলকভাবে বদলি করে মোংলা ও পায়রা বন্দরে সংযুক্ত করে। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও অবৈধ সম্পদ তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়। যদিও একপর্যায়ে বদলির আদেশ স্থগিত করা হলেও আন্দোলন অব্যাহত থাকায় রোববার তা পুনরায় কার্যকর করা হয়।
বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, অভিযুক্ত কর্মচারীরা আন্দোলনের আড়ালে বিশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। এসব অভিযোগের তদন্ত চলমান রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবির জানান, গ্রেপ্তার আতঙ্কে তারা প্রকাশ্যে না থেকে সীমিতভাবে আন্দোলনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে রোববার সকাল থেকে বন্দর এলাকায় কর্মসূচির কারণে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের তিনটি টার্মিনাল ও বহির্নোঙরে পণ্য ওঠানামা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। জেটিতে থাকা একাধিক জাহাজ ও বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ অসংখ্য পণ্যবাহী জাহাজ থেকে খালাস কার্যক্রম স্থগিত থাকে। বন্দরের ভেতরে পণ্য পরিবহন কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়।
বন্দর এলাকায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এতে বন্দরের ইয়ার্ডে বিপুল সংখ্যক আমদানি কনটেইনার এবং ডিপোগুলোতে রপ্তানিযোগ্য কনটেইনার আটকে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন বন্দর চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, বহির্নোঙরে রমজান মাসকে সামনে রেখে খাদ্যশস্য, ভোগ্যপণ্য ও কৃষিপণ্য বোঝাই জাহাজ খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে, যা দীর্ঘস্থায়ী হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট দেখা দিতে পারে।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির নেতারাও এক বিবৃতিতে পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ অযৌক্তিক ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী। এতে দেশের আমদানি-রপ্তানি, শিল্প-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বিবৃতিতে অবিলম্বে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা এবং সংকট নিরসনে প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়
এসআর
মন্তব্য করুন: